Monday, 20 February 2012

কবিতা



                                     
                                                       
          রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ও সমাজ বিষয়ক ভাবনাঃ নির্বাচিত ‘চিঠিপত্রে’র প্রেক্ষিতে

     রবীন্দ্রনাথের গদ্য রচনার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়ে লক্ষ্য করা যায় তাঁর পত্রসাহিত্যের ব্যাপ্তি এই পত্রসাহিত্যের বিষয়-বৈচিত্র্য , ভাবনার বহুমুখী প্রকাশ-ঐশ্বর্য দেখে মনে হয় যেন রবীন্দ্র রচনা হয়তো বা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেত না , যদি না এই পত্রসাহিত্য তিনি আমাদের উপহার দিতেন তাঁর প্রতিটি চিঠিতে আমরা দেখতে পাই বিষয়-বৈচিত্র্য ধর্ম , সমাজ , পল্লীজীবন , নারীর স্বাতন্ত্র্য ,  শিক্ষা , প্রকৃতিচেতনা , প্রেম কোনো কিছুই বাদ পড়েনি তাঁর লেখনীতে তাঁর বিভিন্ন সময়ে লিখিত পত্রগুলি স্থান পেয়েছে ‘ ছিন্নপত্র , ‘ ভানুসিংহের পত্র  ‘ রাশিয়ার চিঠি ’ ইত্যাদি বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর প্রথম গণনীয় গ্রন্থ  ‘ ইউরোপ প্রবাসীর পত্র , কৈশোরে তাঁর ইংল্যাণ্ড ভ্রমণের কাহিণী এতে বর্ণিত এছাড়া পত্নী , পুত্র,আত্মীয়-বন্ধু , সুহৃদ , সহকর্মী ও সহযোগীদের তিনি যত চিঠি লেখেন,তার পরিমাণও কম নয় , বহুখণ্ড ‘চিঠিপত্র’ গ্রন্থে তারা গ্রথিত মানুষ রবীন্দ্রনাথের পরিচয় আছে যাতে
     রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক হেমন্তবালা দেবীকে(রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা , ব্যাক্তিত্বময়ী হেমন্তবালা ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কন্যা ও রংপুর ভিতরবঙ্গের জমিদার ব্রজেন্দ্রকান্ত রায়চৌধুরীর স্ত্রী , তিনি সংসার ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং ছদ্মনামে রবীন্দ্রনাথকে পত্র লিখে তাঁর ‘যোগাযোগ ’,  ‘শেষের কবিতা’র জন্য অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন এবং সেই সূত্রেই তাঁদের পত্র বিনিময় শুরু ।)তাঁর বিভিন্নরকম ধর্মীয় ও সামাজিক প্রশ্নের প্রদেয় উত্তরে রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ও সমাজ বিষয়ক চিন্তাসমূহ প্রকাশিত
     ‘চিঠিপত্রে’র নবম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হেমন্তবালা দেবীকে লিখিত                                    প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম পত্রে রবীন্দ্রনাথ বারবার যে-কথাটি  বলতে চেয়েছেন , তা হলো ভারতবর্ষীয় হিন্দুসমাজের ধর্ম ও আচারের অসদ্ব্যবহার সেই অসদ্ব্যবহারের ফলে সমাজে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে তিনি  হেমন্তবালাকে অষ্টম পত্রে জানান        
    -----সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র ভারতবর্ষেই ভগবানকে পূজার ক্ষেত্রে জাতের     বেড়ায় বিভক্ত করা হয়েছে অর্থাৎ যেখানে শত্রুরা মেলবার অধিকার রাখে,হিন্দুরা সেখানেও মিলতে পারে না এই মর্মান্তিক বিচ্ছেদে হিন্দুরা পদে পদে পরাভূত তারা সর্বজনের ঈশ্বরকে খর্ব করে নিজেদের পঙ্গু করেছে---মানুষকে হিন্দু সমাজ অবমাননার দ্বারা দূর করে দিয়েছে,সকলের চেয়ে লজ্জার বিষয় এই যে,সেই অবমাননা ধর্মের    নামেই ”(চিঠিপত্র ,পৃঃ ৩১০-৩১১)
    তিনি আবার সপ্তম পত্রে(হেমন্তবালা দেবীর পত্র) একজায়গায় বলেন যে বাহ্য আচার মানুষে মানুষে ভেদ ঘটায় এবং মানব প্রেমের মাঝখানে প্রাচীর তোলে , ঈশ্বরপ্রদত্ত বুদ্ধিকে অবজ্ঞা করে শাস্ত্রের অক্ষর বাঁচাবার জন্যে খুনোখুনি করতেও অগ্রসর হয় , তাকে বর্জন করে নাস্তিক ধর্ম গ্রহণ করতে তাঁর কোনো লজ্জা নেই  তিনি যুক্তির প্রতি আস্থা,মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবপ্রেম এইটিকেই মানব-জীবনের বড় সত্য বলে জেনেছেন । তাঁর দৃষ্টিতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানবজাতি একই ধরিত্রীমার সন্তান , কাজেই পৃথক মনোভাব আসাটাই অনুচিত ।
   ষষ্ট পত্রে তিনি বলেছেন হিন্দু সমাজের অনৈক্যের কথা কিন্তু এই অনৈক্য মুসলমান , খ্রিষ্টান সমাজে নেই। তিনি বলেন-
মুসলমান,ধর্মে এক,আচারে এক,বাংলার মুসলমান , মাদ্রাজের মুসলমান , পাঞ্জাবের মুসলমান এবং ভারতবর্ষের বাইরের মুসলমান সমাজে সবাই এক , বিপদে আপদে সবাই এক হয়ে দাঁড়াতে পারে,এদের  সঙ্গে ভাঙ্গাচুরো হিন্দু জাত পারবে না ।”(চিঠিপত্র ৯,পৃঃ ২০৮-২০৯)
আর আমরা প্রায়ই সমাজের এই ধর্মের অধার্মিকতার জন্যই লক্ষ্য করি , প্রায়শই সামাজিক অসম্মান থেকে বাঁচার জন্য নিম্নশ্রেণির হিন্দুরা মুসলমান এবং খ্রিষ্টান হচ্ছে  কিন্তু ভাটপাড়ার চৈতন্য নেই।
    ছুৎমার্গ , আচার,সংস্কার-এসবই আমাদের কাছে বড়ো , সত্যধর্ম আমাদের কাছে এজন্যই বড়ো নয় শুচিতা রক্ষার জন্য আমরা মানুষকে দূরে ঠেকিয়ে রাখি । এই প্রসঙ্গে আমরা রায়কে লিখিত রবীন্দ্রনাথের একটি পত্রের কথা স্মরণ করতে পারি । তিনি সেখানে  অস্পৃশ্যতা , ধর্মের অপপ্রয়োগের প্রতি ধিক্কারবাণী বর্ষণ করে বলেন
 “প্রবাদ আছে,কথায় চিড়েঁ ভেজে না তেমনি কথার কৌশলে অসম্মান তা প্রমাণ হয়না কুকুরকে স্পর্শ করি,মানুষের স্পর্শ বাঁচিয়ে চলি বিড়াল ইঁদুর খায় ,উচ্ছিষ্ট খেয়ে আসে , খেয়ে আচমন করে না , তদবস্থায় ব্রাহ্মণীর কোলে এসে বসলে গৃহকর্ম অশুচি হয়  না মাছ নানা মলিন দ্রব্য খেয়ে থাকে , সেই মাছকে উদরস্থ করেন বাঙালি ব্রাহ্মণ , তাতে দেহে দোষ স্পর্শ হয় না ....উচ্চবর্ণের মানুষ যেসব দুষ্কৃতি করে থাকে তার দ্বারা তাদের চরিত্র কলুষিত হলেও দেবমন্দিরে তাদের অবাদ প্রবেশ   (রবীন্দ্রনাথের চিন্তাজগৎসমাজচিন্তা’- অন্তর্গত মতিলাল রায়কে লিখিত পত্র,পৃঃ ২৫৬)
 রবীন্দ্রনাথের মতে , জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল দেশের সকল জাতি সমান , জাতের দোহাই দিয়ে কাউকে হীনজ্ঞান করা উচিত নয় তাঁর মতে সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে  নাই যুগ যুগান্ত থেকে একথা বলা হচ্ছে,রবীন্দ্রনাথও এই মতে একমত।এ বাণী যুগের বাণী কবি একথটাকেই বলেছেন একটু অন্যভাবে কবির ধর্ম একাধারে বাস্তবের উপর ভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ধর্ম পরিপূর্ণ মানবতার ধর্ম ধর্ম কর্মে কঠোর জ্ঞানে উজ্জ্বল,ভক্তিতে রসাপ্লুত সৌন্দর্যে সমন্বিত
  হেমন্তবালা দেবীর কাছ থেকে পূজার বর্ণনা শুনার পর তিনি উত্তরে বলেন-
  তোমার লেখায় তোমাদের পূজার বর্ণনা শুনে আমার মনে হয় সমস্তই অবরুদ্ধ অতৃপ্ত  অসম্পূর্ণ জীবনের আত্মবিড়ম্বনা আমার মানুষরূপী ভগবানের পূজাকে এত সহজ করে তুলে তাঁকে যারা প্রত্যহ বঞ্চিত করে তারা প্রত্যহ নিজে বঞ্চিত হয় তাদের দেশে মানুষ একান্ত উপেক্ষিত,সেই উপেক্ষিত মানুষের দৈন্য দুঃখ সে দেশ ভারাক্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে সকল দেশের পিছনে পড়ে আছে সব কথা বলেতোমাকে ব্যথা দিতে আমার সহজে ইচ্ছা করে না ­­­   কিন্তু যেখানে মন্দিরের দেবতা মানুষের দেবতার প্রতিদ্বন্দ্বী,যেখানে দেবতার নামে মানুষ প্রবঞ্চিত সেখানে আমার মন ধৈর্য্য মানে নাগয়াতে যখন  বেড়াতে গিয়েছিলেম তখন পশ্চিমের কোন্ এক পূজামুগ্ধা রাণী পাণ্ডার পা মোহরে ঢেকে দিয়েছিলেন  ক্ষুধিত মানুষের অন্নের থালি থেকে কেড়ে নেওয়া অন্নের মূল্যে এই মোহর তৈরি । দেশের লোকের শিক্ষার জন্যে আরোগ্যের জন্যে এরা কিছু দিতে জানে না,অথচ নিজের অর্থ-সামর্থ্য সময় প্রীতি ভক্তি সমস্ত দিচ্চে সেই বেদীমূলে যেখানে তা নিরর্থক হয়ে যাচ্চে । মানুষের প্রতি মানুষের এত নিরৌৎসুক্য,এত ঔদাসীন্য অন্য কোনো দেশেই নেই,এর প্রধান কারণ এই যে,এ দেশে হতভাগা মানুষের সমস্ত প্রাপ্য দেবতা নিচ্চেন হরণ করে ।”(“রবীন্দ্রনাথের চিঠি অন্তরঙ্গ নারীকে”পৃঃ ১২৭)
   রবীন্দ্রনাথ আরও মনে করেন,আমাদের দেশ ভারতবর্ষের পিছিয়ে পড়ার পেছনে যে কারণটি আসল,তা হল মানুষকে হীনজ্ঞান করা । আমাদের ধর্মকে যদি সত্য পথে পরিচালিত করা যেত , পূজার মধ্যে যথার্থ বীর্য্য , সেবার মধ্যে ত্যাগ থাকত, আমাদের সাধনা যদি যথার্থ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মানুষকে সম্পূর্ণ আত্মীয়তার সঙ্গে স্বীকার করতে পারত তাহলে কখনোই দেশকে এত যুগ ধরে এত দৈন্য এত অপমান সহ্য করতে হতো না । দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের লোক এত দুর্ভর অজ্ঞানের চাপে অসহায় ভাবে দৈবের দিকে তাকিয়ে বিলীন হতো না ।
   সেই প্রসঙ্গে তিনি অপরদিকে ইউরোপবাসীর ভাবনার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন
     “য়ুরোপে এমন অনেক নাস্তিক আছেন যাঁরা বিশ্বমানবের উপলব্ধির দ্বারা তাঁদের কর্ম্মকে মহৎ করে   তোলেন ,তাঁরা দূর কালের জন্যে প্রাণপণ করেন,সর্ব্বদেশের    জন্যে তাঁরা যথার্থ ভক্ত যাঁরা আচারে অনুষ্ঠানে সারা জীবন অত্যন্ত শুচি হয়ে  কাটালেন , ভাবরসে মগ্ন হয়ে রইলেন ,তাঁরা তো নিজেরই পূজা করলেন তাঁদের শুচিতা তাঁদেরই আপনার , তাঁদের রসসম্ভোগ নিজের মধ্যেই আবর্ত্তিত , আর মুক্তি বলে যদি কিছু তাঁরা পান তবে সেটা তো তাঁদেরই পারলৌকিক কোম্পানির কাগজ  ---আমি যাকে পাবার প্রয়াস করি সেই মনের মানুষ সকল দেশের সকল মানুষের মনের মানুষ, তিনি স্বদেশ স্বজাতির উপরে । আমার এই অপরাধে যদি আমি স্বদেশের লোকের অস্পৃশ্য , সনাতনীদের চক্ষুশূল হই তবে এই আঘাত আমাকে স্বীকার করে নিতেই   হবে ।”(“রবীন্দ্রনাথের চিঠি অন্তরঙ্গ নারীকে”,পৃঃ ১৩০)
   রবীন্দ্রনাথ মনে করেন দেহের কলুষ জলে ধুলেই যায়,কিন্তু মনের কলুষ বাহ্য স্নানে দূর হয় মনে করা মূঢ়তা কাজেই , কোনও জাতিকে হীনজ্ঞান করা অন্যায় জাতি-ধর্ম নির্বশেষে প্রতিটি মানুষকে উপলব্ধি করতে হবে যে দেবতা সর্বকালে সবার চির আরাধ্য, তাঁকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাবা মানে দেবতার অপমান এই ধারণা সম্বন্ধে অবহিত না হলে ‘ভারতবর্ষে’ দেবতা অপমানিত , মানুষ অপমানিত ; এই কলঙ্কের বোঝা মুছবে না    



 



১. “চিঠিপত্র”-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. “রবীন্দ্রনাথের চিঠি অন্তরঙ্গ নারীকে”-ড. দিগ্বিজয় দে সরকার ।
৩. “আমার দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ” –ড. ব্রজগোপাল রায় ।
৪. ‘দ্বিরালাপ ৪৭’,সাহিত্যপত্র ।
৫. “রবীন্দ্রজীবনে গোপনচারিণী” –রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ।